ফরিদুল আলম ফরিদ: মরমি সাধক ও বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় তাঁর আখড়াবাড়িতে বসেছে সাধুর হাট। শনিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে দেশ-বিদেশের সাধু, গুরু, বাউল ও ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সাঁইজির ধাম।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ স্মরণোৎসব। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য-‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে মূল অনুষ্ঠান শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই সমবেত হতে শুরু করেন বাউল সাধকেরা। আখড়ার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে তাঁরা পরিবেশন করছেন লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন ও মর্মবাণীসমৃদ্ধ গান। পাশাপাশি সাধু-গুরুদের মধ্যে চলছে ভাব, ভক্তি ও দর্শন বিনিময়।

প্রচলিত সাধু রীতি অনুসারে, শনিবার সন্ধ্যায় বাল্যসেবা, রোববার সকালে রাখালসেবা এবং দুপুরে পুণ্যসেবার আয়োজন রয়েছে। এসব আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে লালনের সাধনা, দর্শন ও ঐতিহ্য অনুসরণ করবেন সাধু-ভক্তরা।
উদ্বোধনী দিনে শনিবার বিকেল তিনটায় কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিন দিনব্যাপী বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের (মৃত্যুবার্ষিকী) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী (এমপি)। গেস্ট অব অনার থাকছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক থাকছেন প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. রশিদুল নবী।
বিশেষ অতিথি থাকছেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ, সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া-৪ সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বিশিষ্ট লালন সাধক হৃদয় শাহ, বিশিষ্ট লালন সাধক মিজ্ আসমা খানম প্রমুখ।
আলোচনা পর্ব শেষে বিকেল ৫টায় লালন মঞ্চে শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পী ও লালন একাডেমির স্থানীয় শিল্পীরা লালনসংগীত পরিবেশন করবেন।
তিরোধান দিবস উপলক্ষে আখড়াবাড়ির সামনে মরা কালি নদীর প্রাঙ্গণে বসেছে গ্রামীণ মেলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা দুই শতাধিক স্টলে তাঁদের পসরা সাজিয়েছেন। সাধু-ভক্তদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মেলাপ্রাঙ্গণেও তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের।

ফকির লালন সাঁই বাংলা লোকসংগীত ও মরমি সাধনার ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তাঁর গান ও দর্শনে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতা, সাম্য ও আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে। জাত-পাত, ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি।
লালনের জন্মপরিচয় ও জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও তাঁর জীবন ও সাধনার বহু দিক আজও গবেষণার বিষয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ায় তিনি দেহত্যাগ করেন। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আখড়াবাড়িকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর তিরোধান দিবসে সাধু-ভক্তদের সমাগম ঘটে।
লালনের গান শুধু সংগীত নয়; এর মধ্যে রয়েছে জীবন, জগৎ, আত্মপরিচয় ও মানবতার গভীর অনুসন্ধান। ছেঁউড়িয়ার সাধুর হাট তাই কেবল একটি স্মরণোৎসব নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও মরমি দর্শনের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
Leave a Reply